মৌলভীবাজারে হত্যা মামলার আসামি আব্দুল নুর সানি ধরাছোঁয়ার বাইরে

sylhet24hours.com
প্রকাশিত 10 March, Monday, 2025
মৌলভীবাজারে হত্যা মামলার আসামি আব্দুল নুর সানি ধরাছোঁয়ার বাইরে

মৌলভীবাজার পৌরসভার সামনে ও চৌমূহনা এলাকায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার স্থিরচিত্র


নিজস্ব প্রতিবেদক
মৌলভীবাজারের বহুল আলোচিত জুলাই আগস্টের হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-প্রচার সম্পাদক আব্দুল নুর সানি দীর্ঘ সাত মাসেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও রহস্যজনক কারণে তিনি এখনো অবাধে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজার পৌরসভার সামনের সড়কে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা অবস্থান নেন। আন্দোলনে যোগ দেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। হঠাৎ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গুলি, পিস্তল, হকি স্টিক ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এ সময় ব্যাপক গুলি ছোড়া হয়।
হামলায় গুরুতর আহত হন আন্দোলনকারী সেবুল আহমদ। তার বাম চোখে গুলি লাগে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই হত্যাকান্ডে পর দিনই, ৬ আগস্ট, মৌলভীবাজার সদর থানার এসআই নাজমুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
এজাহারে মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান রুবেল, জবরুল ইসলাম, সাহেল আহমদ, জুবায়ের আহমদ চৌধুরী, ওবায়দুল ইসলাম রুয়েল, লায়েক আহমদসহ মোট ৪৫ জনকে আসামি করা হয়। প্রধান আসামি করা হয় মৌলভীবাজার জেলা যুবলীগ সভাপতি আনসার মিয়াকে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বেই ওইদিন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
এজাহারের ২১ নম্বর আসামি ছিলেন আব্দুল নুর সানি। যদিও তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না, তদন্তে উঠে আসে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে আর্থিক সহায়তা ও কৌশলগত সহযোগিতা দিতেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, যুক্তরাজ্যে বসে সানি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার জন্য অর্থ পাঠাতেন। শুধু তাই নয়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বাসা-বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে তিনি সরবরাহ করতেন যুবলীগ সভাপতি আনসার মিয়ার কাছে। পরবর্তীতে সেসব ঠিকানার ভিত্তিতেই হামলা, ভয়ভীতি ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ।
আব্দুল নুর সানি একাধিকবার মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের উপ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তার রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকান্ডে তার বড় ভাই আব্দুল মুহিত রনিও সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
বিগত ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সদর থানায় তাদের দু’ভাইয়ের নামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অভিযোগে একটি প্রতারণার মামলা দায়ের করেছিলেন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সচিব আব্দুর রহিম রিপনের ছোট ভাই ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল কায়ূম রুমান।
২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে আব্দুল নুর সানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে এ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে-বিদেশে অবস্থান করলেও তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ কেন দৃশ্যমান নয়।
এদিকে মামলাটি বর্তমানে মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। নিহত সেবুল আহমদের পরিবার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, প্রধান আসামি ও সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, এ মামলাটি প্রমাণ করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কিভাবে সংঘটিত হচ্ছে। একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দেশের বাইরে থেকেও কীভাবে আর্থিক ও কৌশলগতভাবে এমন সহিংসতায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মৌলভীবাজারের সচেতন মহল মনে করেন, সানি ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের এ হত্যা মামলা ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনেও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা সত্ত্বেও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল নুর সানির ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্তা ক্ষুণ্ণ করছে।
এখন দেখার বিষয়, আদালতের নির্দেশ ও জনমতের চাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কবে আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন